Pages

Thursday, April 5, 2018

মক্কা ও রুক্ষ প্রকৃতি


মক্কায় এসে প্রকৃতির রুক্ষতার বাস্তব রূপ দেখলাম। পাহাড়গু‌লিতে কোন লতা গুল্ম নেই। কোথাও কোন গাছ নেই। শক্ত শিলা আর পাথরের পাহাড়। আমি সি‌য়েরা‌লিওন ও কং‌গোর শিলার পাহাড় দেখেছি।  সেখানে পাহাড়গু‌লো শিলার মাঝেও সবুজ ছিল। কারণ সেখানে অনেক বৃষ্টি হয়। এখানকার পাহাড়গু‌লো কাল ও ধূসর। প্রকৃতি এখানে ভয়াবহ রকম নির্মম। মানুষের বেঁচে থাকাটা অবিশ্বাস্য। তার মাঝে মানুষ বেঁচে আছে। বাংলাদেশ থেকে আসার পর এরূপ রুক্ষ প্রকৃতিতে যে কেউ অবাক হবেন। এখন প্রচুর দালান হ‌য়ে‌ছে। সাগর থেকে পানি ডিস্যালানাইজ ক‌রে আনা হচ্ছে ।
অল্প পানিতে গাছ জন্মানো হচ্ছে। গাছের গোড়ায় পাইপ লাইন দি‌য়ে ড্রিপ ইরি‌‌গেশন প্রক্রিয়ায় পানি দেয়া হচ্ছে। রাস্তার মাঝের আয়ল্যা‌ন্ডে সবুজ সতেজ গাছ। দেখে মনটা কিছুটা রুক্ষতার মাঝে সতেজ হয়। এখনকার গাছগু‌লো জন্মা‌নো অনেক খরচের ব্যাপার। ড্রিপ ইরিগেশন আর গাছের নীচ দি‌য়ে পাইপের মাধ্যমে অনেক ব্যয়বহুল পানির সরবরাহ।
গোটা সৌ‌দি আরবে ২০১৭ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী লোকসংখ্যা ২ কোটি ৭১ লক্ষ। এর মধ্যে আরব ৮৪ লক্ষ। এখানে যে লো‌কের বাস তার চে‌য়ে ছয় গুন বেশী হল বাংলাদেশের মানুষ। আরব দেশ বাংলাদেশ থেকে প্রায় দশগুণ বড়। মক্কার পুরো জনপদ বেঁচে আছে আমদানি নির্ভরতার উপর। শহরের বাইরে প্লাস্টার ছাড়া ঘন ক‌রে তৈরি করা দুইতলা তিনতলা বাড়িঘর। এগু‌লো রো‌হিংগা বা বার্মিজ লোক‌দের বাড়ী।  সাধারণত এরা নিজেদের চট্টগ্রাম বা কক্সবাজারের বাসিন্দা হিসাবে পরিচয় দেয়। মক্কার পশুর হাট ও বড় বড় পাইকারি বাজার কুষ্টিয়া বাড়ী একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার অত্যন্ত যত্ন সহকারে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাল। অনেক জায়গা নি‌য়ে বিশাল পার্কিং এলাকা। আমরা বাংলাদেশীরা ভাগ্যবান আমাদের মাটি ও প্রকৃতি বসবাসের জন্য অত্যন্ত ভাল। তাই মানুষ বেশী। গাছ বেশী। পশুপাখি বেশী সবই আমা‌দের বেশী বেশী। মক্কার অদূরে বাঙ্গালীদের বসবাস এলাকায় দেখলাম পুরাণ ঢাকার মত গিঞ্জি এলাকা ও পুরাণ ঢাকার মতই অপরিষ্কার সব্জিবাজার। মক্কায় মিসফালাহর আশে পাশে দোকা‌নের বেশীর ভাগ দোকানী চট্টগ্রামের বা কক্সবাজারের।
বাংলায় কথা বলার মানুষের অভাব নাই। পাকিস্তানীদের আধিপত্য রয়েছে হো‌টেল ব্যবসা ও টে‌ক্সি ব্যবসায়। পাকিস্তানীরা হিন্দি বা আরবি দুইটিই ভাল বু‌ঝে। ইংরেজি একদম বুঝা‌নো যায় না। কবুতর এখানে বিশেষ আদর পাচ্ছে। কিছু মহিলা পুরুষ কবুতরের খাবার বিক্রয় করছে। লোকজন কবুতরের খাবার কিনছে আর তা কবুতর‌কে খাওয়াচ্ছে। এখানে সব কিছুর মূল্য এক রিয়েলের নীচে নয়। তাই এক রুটির দাম এক রিয়াল বা ২২ টাকা হলে তা বেশীই বল‌তে হবে। সব কিছুর মূল্য বেশী। খাবারের দামও বাংলাদেশ হতে বেশী। ওমরা বা হজ্বে বাসা বাড়ী‌তে প্যাকেজে রান্না ক‌রে খেলে খরচ কম পড়‌তে পা‌রে। এছাড়া হো‌টে‌লে হো‌টে‌লে খেলে খরচ যথেষ্ট পড়ে যায়। মক্কায় চাইনিজ জিনিষে বাজার ভর্তি। এখানে এমন কোন আইটেম চেখে পড়ল না যা ঢাকা নিউ মার্কেটে পাওয়া যায় না। তবে চাইনিজরা এখানে শুল্ক ছাড়া প্রবেশাধিকার পায় বলে চাইনিজ দ্রব্যাদির মূল্য কম।
প্যাকেজে যারা আসেন তারা সম্পূর্ণ ভাবে সব কিছু গাইড করেন। তাই অনেক বিষয় আবার ভালভাবে জানা যায়। সবাই দেশের জন্য বাজার কর‌তে চায়। বাংলাদেশী কোন ড্রাইভার সাথে থাকলে কোথায় কোন জিনিষটা ভাল পাওয়া যায়। তার একটা গাইডলাইন পাওয়া যায়।
মক্কার এই বৈরী আবহাওয়ায় মাঝে উদ্যান করার চেষ্টাটি যথেস্ট ভাল উদ্যোগ। হজ্জের নগরী বলে এই নগরীর যাবতীয় কার্যক্রম বেশ মনোমুগ্ধকর। আমাদের বাংলাদেশী মানুষদের মরুভূমির রুক্ষতা দেখে সত্যি মনে হয় আমাদের দেশটা মক্কার তুলনায় অনেক বেশী মানবীয়। তাই হয়তোবা আমাদের দেশে এত জন সম্পদ। আমার বাবা অনেক দেশে ভ্রমণকারী একজন মানুষ। তিনি বাগান করা বেশ পছন্দ করেন। তিনি প্রায়ই সবাইকে বলেন, বাংলাদেশের মাটি হল উর্বর। কোন বীজ মাটি খুঁচিয়ে ফেলে রাখ সহজে গাছ হবে। আমি মক্কায় গিয়ে অনুধাবন করলাম মাটি কত রুক্ষ ও পাথুরে হতে পারে। পাহাড়ের রং ধূসর বা কালো হতে পারে। পরিশেষে বলব, বর্তমানে রুক্ষ মরুভূমিতে সবুজের সমারোহ করার আরবিয় চেষ্টাগুলো প্রশংসার যোগ্য।

Thursday, March 29, 2018

নন ফিকশন বনেদী প্রবন্ধ লেখকদের হাল হকিকত


নন ফিকশন প্রবন্ধ লেখকরা সাধারণত বনেদী লেখক হন। তা‌দের পাঠক কম। কিন্তু তা‌দের ক‌মিট‌মেন্ট তুলনামূলকভা‌বে বেশী। তা‌দের অনেক পড়‌তে হয়। সামাজিক সমস্যা গু‌লো নিরূপণ কর‌তে হয়। সমস্যার গভীরে যেত‌ে হয়। নিজে নিজে রিসার্চ কর‌তে হয়। বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা কর‌তে হয়। পুরো প্রক্রিয়াটা সময় সাপেক্ষ। ফলাফল "নন ফিকশন" বই‌য়ের পাঠক কম। বিক্রি কম। লেখক‌ের অনুপ্রেরণা কম। তবে প্রবন্ধকারের আতলামী বই বিক্রয় না হলেও বন্ধ হবে না। কারণ আতলামী একটা অভ্যাস। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় প্রবন্ধকার হওয়া বাদ দি‌য়ে প্রেমের উপন্যাস লেখক হ‌য়ে যাই। অন্তত মানুষ‌কে অনেক আনন্দ দি‌তে পারব। রোমান্ট‌িক রোমান্ট‌িক ছোট গল্প লিখ‌তে থাকি। মনটা রোমান্ট‌িক থাকবে পাঠক ও পাঠিকা বাড়বে। অথবা লক্ষ কবির মাঝে কিছু উদ্দাম কবিতা নি‌য়ে‌ ঝাঁপি‌য়ে পড়ি অথবা পৃথিবীর বেস্ট সেলার থ্রিলারগু‌লো মূখ‌রোচক ক‌রে বাংলা ভাষায় উপস্থাপন করি। বাজা‌রে ভাল চলবে। এগু‌লো হল সাময়িক অসংলগ্ন ভাবনা। মূল ভাবনাটা হল আমি আমিই। আমি "নন ফিকশন" প্রবন্ধ লেখক। সেদিন আমার ড্রাইভার বলল, স্যার, আমি আপনার "স্বনির্বা‌চিত কলাম" বই‌টির সব লেখা পড়েছি।
আমি ভাল ফিল করলাম।
তোমার অনুভূতি কি?
"স্যার, আপনি আমা‌দের জীবনের নানা সমস্যা এত সহজ সমাধান দিয়েছেন। আমার খুব ভাল লেগেছে। আমি আপনা‌কে আরো সামাজিক সমস্যা দিচ্ছি যা আপনি লিখ‌তে পারেন।" আমার ড্রাইভার আরো বলল, "আপনার লেখা পড়ার পর আমার চিন্তা ভাবনা ও জানার আগ্রহ বেড়ে গেছে"।
আমি মনে মনে ধন্য মনে করলাম। আমার লেখাগু‌লোর সমাজের নিন্ম মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের বেশী আকর্ষণ করবে সন্দেহ নেই। আমার বই‌য়ের" ফ্লাট কেনার ফর্মুলা" ও "ফুল ফলের পরিবর্তে রোগী‌দের নগদ টাকা আশীর্বাদ দেয়া" আটির্ক্যাল দু‌টি ব্যাপক আলো‌চিত হওয়ার পর আর প্রতিনিয়ত বই বিক্রি অব্যাহত থাকায় মনে হল "নন ফিকশন" বই কাটতির চ্যালেঞ্জটা কমছে।
কারণ আমি প্রচার বিমুখ মানুষ ও বিজ্ঞাপন মুক্ত মানুষ। ছোট্ট ক‌রে ছ‌বিসহ আমার বই‌য়ের বিজ্ঞাপন দিতে খরচ হবে প্রায় দশ হাজার টাকা। যা দি‌য়ে প্রায় ২০০ বই আমি বিভিন্ন লাইব্রেরীতে দি‌তে পারছি। প্রকাশক এই যুক্তিতে হার মেনে বলল "আপনি আপনার মতই থাকুন"।
আসলে আমরা আমা‌দের মত থাকার মধ্যেই আনন্দ আছে।
নন ফিকশন বইয়ের আবার বিজ্ঞাপনটা বেশ জটিল। সিনেমার থ্রিলারের মত ক্লাইম্যাক্স দিয়ে গল্প ও উপন্যাসের কিছু অংশ তুলে ধরলে পাঠককে জাগ্রত করা যায়। কারণ পাঠক বিনোদনের জন্য বই যখন পড়ে তখন গল্প ও উপন্যাস লেখক অনেকটা লেখকের নাম ও পরিচয় গুরুত্ব না দিয়ে পড়ে থাকে কারণ পাঠক জানে গল্প ও উপন্যাসে কিছু না কিছু জীবনধর্মী বিনোদন থাকবে। তাই গল্প উপন্যাস পড়ার জন্য পাঠককে আকর্ষন করার জন্য তেমন একটা কসরত লেখক বা প্রকাশককে করতে হয় না।
তবে নন ফিকশন বইয়ের ফ্লাপ কাভার ও সূচীতে বিষয় ভিত্তিক আলোচ্য সূচী পরিষ্কার করে তুলে ধরতে হবে। আমি আমার প্রথম বই স্বনির্বাচিত কলামনাম দেয়ার পর অনেক পাঠক আমাকে বললেন নামটা হয়ে গেছে গতানুগতিক। স্বনির্বাচিত কবিতা, স্বনির্বাচিত গল্প, নির্বাচিত কলাম এগুলো বাজারে প্রচলিত নাম। এর থেকে বেরুতে হবে। নন ফিকশন রাইটারদের লেখার নামটি অনেক অনেক গুরুত্ব বহন করে। সাতকাহনআর একটুখানি উষ্ণতার জন্যদুইটি উপন্যাসের দুইটি নামের দুই রকম আনন্দময় পাঠ নির্দেশ করে তবু পাঠক কাছে টানার জন্য উপন্যাসের নাম দুটো চমৎকার।
নন ফিকশন বইয়ে চাপটারে চাপটারে বোল্ড করে কিছু চুম্বক অংশ উদ্দীপক দিলে পাঠক পড়তে আগ্রহী হতে পারে। বইটি যেহেতু আনন্দ অপেক্ষা জানা ও সমস্যা সমাধানমূলক তাই এই বিষয়ে কিছু তথ্য ব্যাক কাভারে রাখতে হবে। আমাদের দেশে ব্যাক কাভার সাধারণত খালী থাকতে দেখা যায়। ব্যাক কভারের ও ফ্লাপের রাইট আপ পাঠক পড়ে এবং এর মধ্যে নন ফিকশন বইটি কেন পড়বে এবং তাতে লাভ কি তা তুলে ধরতে হবে।
নন ফিকশন বই সাধারনত সমঝদার ও বয়সী লোকজন বেশী পড়ে থাকে। তাই নতুন ও ইয়াং পাঠককে এই ধরনের বইয়ে কাছে টানার জন্য টপিকগুলো ইয়াংদের উপযোগী রাখতে হবে। পরিশেষে আশা করি ইয়াংরাও নন ফিকশন বই পড়বে ও আনন্দ পাবে তেমন সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। এতেই আমরা প্রবন্ধ লেখকরা সফল হব।

Friday, March 23, 2018

"সপুংশক লেখক" বা টাকা দিয়ে বই ছাপানো লেখক


আমি লেখকদের সাথে কথা বললে প্রকাশক বই ছাপাতে টাকা নিয়েছে কিনা তা জানতে চাই। যার বই আছে তাকেই প্রশ্নটা করি। যারা টাকা দিয়েছে তারা লজ্জায় মেনে নেয় তারা টাকা দিয়েছে। যাদের বই প্রকাশকরা বিনা পয়সায় ছাপিয়েছে তাদের ভাব বা গর্ব আলাদা। এমন ভাব প্রকাশকরা তাদের পা ধরে বসে থাকে। হায়রে লেখক। হায়রে প্রকাশক। আমার প্রথম বই প্রকাশকের প্যাচে পড়ে টাকা খরচ করে ছাপিয়ে আমি সত্যি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি নিজের টাকায় বই না ছাপালে প্রকাশনা শিল্পের এই গ্রে এরিয়াগুলো জানতাম না। টাকা খরচ করে বই ছাপানোর কারণে  আমি বাংলাদেশের জন্য নতুন প্রকাশনার ধারনা প্রবর্তন করতে পারছি।
আমি একজন লেখকের সাথে কথা বললাম। সে জানাল তার প্রথম উপন্যাস প্রকাশ পাওয়ার পর তা  পুরস্কার পেয়ে গেল। তাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। তারপর প্রকাশকরা আর পত্রিকাওয়ালা তার পিছনে লাইনে আছে। তিনি লিখে কুলাতে পারছেন না। ভয়ানক সফল লেখক। আর একজন লেখক পেলাম তিনি আমার ফেইস  বুক পোস্টের মধ্যে এ্যাড দিলেন তার বইয়ের। মহা বিরক্তিকর। তাকে ইনবক্স করে জানতে চাইলাম, আপনার বই বের করতে প্রকাশক কত নিল। তিনি দম্ভের সাথে বললেন, কেন টাকা দিব। আমার লেখা যাচাই বাছাই করে নওরোজ কিতাবিস্থান বই ছাপিয়েছে। যাদের রয়েছে যুগের পর যুগ অভিজ্ঞতা। তিনি তার লেখার উচ্চ মর্গতা নিয়ে কথা বললেন। আর একজন আন্তরিক লেখক তার বইটা দেখালেন। তিনি  জানালেন তার  ফেস বুক জনপ্রিয়তাকে কনসিডার করে প্রকাশক বিনে পয়সায় তার বইটি প্রকাশ করার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। যাদের বই প্রকাশকরা বিনে পয়সায় ছাপাচ্ছেন তারা স্বাভাবিক কারণে অত্যন্ত উচুমার্গের লেখক ভাবতে থাকেন। অনেক গর্ব। তাদের সাথে কথা না বললে বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন। অনেকটা সফল ক্রিকেটারের মত। সেঞ্চুরি করার করার পরের হাল হকিকত। প্রকাশককে টাকা দিয়ে বই ছাপিয়েছে বলতে সবাই লজ্জা পায়। কেমন যেন অপরাধী অপরাধী মনে করে। আমি ব্যতিক্রম । বড় গলায় বলছি। আমার সাহিত্যের মান ভাল না। প্রকাশক বিনে পয়সায় ছাপতে চায়নি তাই টাকা দিয়ে বই ছাপিয়েছি।
এতে আমি লজ্জা পাচ্ছি না । কারণ লেখার মান সবার সমান হবে না। বানান ভুল থাকবে। লেখনীতে সাহিত্য কম থাকবে। কিন্তু সাহিত্য ভাষা যত কমই থাকুন না কেন। ভাল বিষয় বস্তু হৃদয়গ্রহিী হয়। এটা আমি বড় গলায় বলতে পারি। আমার সেনা জীবনের নেতৃত্বের প্রথমে শিখেছি তোমার ভাষার প্রকাশটা হরে এরূপ, যেন তোমার অধীনের মানুষগুলো বুঝতে পারে। সত্যি কথা বলতে কি সেদিন থেকে আমি বাংলায় সাহিত্য হারিয়ে ফেলেছি। ভাষা হয়ে গেছে সাদামাটা। সাহিত্যের রসাল ভাবটা অনুপস্থিত। সকলে যেন বুঝতে পারে আমার উপস্থাপনা ও কথা, এমন ভাবেই আমি উপস্থাপনা করি। এভাবেই লিখতে অভ্যস্ত হচ্ছি। আমাকে কয়েকজন বলল, আমি নাকি কঠিন কথা সহজ ভাবে বলি। এটার কারণ হল আমার কথায় সাহিত্য নাই। সকল কথা কথ্য ভাষায় বলি ও লিখি। আমার সাহিত্য প্রকাশকদের চলবে না। এটা চলবে ফেইস বুক আর ব্লগে। আর চলবে শিশু সাহিত্যে। সাহিত্যিক হওয়ার ইচ্ছে যোগ্যতা বা বাসনা আমার কোন কালে ছিল না। আমার আগ্রহ ছিল কোনটা ভাল ও কোনটা মন্দ তা নিয়ে বলা বা লেখা। তাইতো গল্প, উপন্যাস ও কবিতা লিখতে চেষ্টা করিনি। কারণ রোমান্টিকতা দিয়ে নায়িকার চুলের বর্ণনার সাহিত্য, আমার জন্য বড়ই জটিল। সেজন্য স্ত্রীর কাছে আমি একজন চরম অরোমান্টিক  মানুষ। তাই নন রোমান্টিক ও নন ফিকশন লেখা ছাড়া উপায় নাই। বাংলা একাডেমীর মোটা মোটা দুই বাংলা ডিকশেনারী দেখে আর অভ্র সফটওয়্যার ব্যবহার করে বানান ঠিক করি। আমি চার জন উন্নত ও ডিমান্ডিং লেখকের সাথে কথা বলে বুঝলাম লেখাটা আমার কাজ নয়। পেমেন্টে আর কয়দিন বই প্রকাশ করব। ৪০ হাজার টাকায় ১০০০ বই ছাপালাম। ৫০০টি বই সৌজন্য কপি বিতরণ করলাম। ৪৩০টি বই বিক্রি করে  খরচের টাকাটা পুরো তুলে ফেললাম। লাভের ৭০টি বই ধীরে ধীরে বিক্রি করছি। এদিকে দ্বিতীয় বই রেডি। টাকাও রেডি। আমার সাপ্তাহিক  আর্টিক্যাল যা লেখা আছে তা দিয়ে চার ফর্মার সাত খণ্ড বই বের করা যাবে। আমি নিজের টাকায় বই বের করছি নিজে বিক্রি করছি। বিতরণ করছি। প্রথম প্রথম বই বিক্রি করতে লজ্জা লাগত। এখন দেখলাম লজ্জা লাগছে না। কারণ উন্নত দেশে প্রতিনিয়ত সেলফ পাবলিকেশন বাড়ছে ও জনপ্রিয় হচ্ছে। এতে লেখকের লাভ বেশী। প্রকাশক নামক মধ্যসত্বভোগী নাই। ইউরোপ ও আমেরিকার সেলফ পাবলিশ লেখকরা আমাদের দেশের লেখকদের মত মুখ লুকায় না। ওরা গর্বিত হয়। কারণ সে সেলফ পাবলিশ করছে ও বেশী টাকা কামাচ্ছে। প্রকাশক নামের কেউ তার মেধা দ্বারা অর্জিত টাকায় ভাগ বসাচ্ছে না। প্রকাশক ১০০০ বই বিক্রি করে যে টাকা দেয়, সেলফ পাবলিশ করে ১০০ বইয়ে লেখকরা  সেই টাকা তুলতে পারে। এতে লেখকদের লাভ বাড়ছে। লেখকরা একটু কষ্ট করে সময় বের করে সেলফ পাবলিশে এগিয়ে আসছে। সেলফ পাবলিশ লেখকরা একেকজন একেকটা উদ্যোক্তা। শুধু মাত্র লাভ বেশী থাকার কারণে আমাজনে সেলফ পাবলিশ লেখকের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়ে যাচ্ছে। ই-বুক আর "প্রিন্ট বুক অন ডিমান্ড" সেলফ পাবলিশ লেখকদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নন ফিকশন লেখকরা বেশী উপকৃত হচ্ছে। প্রক্রিয়াটি আর্থিক ভাবে লেখকদের লাভবান করছে। তাই সেলফ পাবলিশ লজ্জার কিছু নাই। সেলফ পাবলিশ করেছি বলে আমার লেখার মান ভাল হল না। এটা একটা ফানি বিষয়। আমার কাছে মনে হয় লেখার ভাষা ঠিক করার জন্য অনেক পেইড সম্পাদক আছে।তাদের দিয়ে পেমেন্টে সাহিত্য সংযোজন সম্ভব। এটা অনেকটা হায়ার করা উপস্থাপক বা প্রেজেন্টারের মত। তাই লেখার ভাষা ঠিক করার থেকেও বিষয় বস্তু বেশী গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অনেক সুন্দর গুছিয়ে কথা বলা বক্তার অন্তঃসার শূন্য বক্তব্য কিন্তু শুনি। আবার অনেক গ্রামীণ টানে কথা বলা লোকের চমৎকার বিষয় বস্তুর উপস্থাপনাও শুনি। উন্নত লেখক আর অনুন্নত লেখকদের আমরা মজা করে বলতে পারি "ব্রাহ্মণ  লেখক" আর "নমশূদ্র লেখক"। এ  বিভাজনে আমি যেতে চাই না। "বই কথা বলবে, আমি কেমন লেখক" এটাও মানতে পারি না। লক্ষ বইয়ের ভিতর আপনি মাইক না বাজালে আপনার বই চলবে না। এটা বাস্তব কথা। যে যাই বলুন, বই একটা "পণ্য" বা প্রোডাক্ট। এটা পণ্যের মতই বিক্রি করতে হবে। লজ্জার কারণ নাই।
নমশূদ্র লেখকদেরও লজ্জা পাওয়ার কোন কারণ নেই। আপনি নমশূদ্র লেখক হয়ে যদি অনেক পাঠক পান তবে দু:খ করার কিছু নাই। পাঠক যদি আপনি বেশী তৈরি করতে পারেন তবেই আপনি সফল। আমি বলব, প্রকাশক বাদ দিন। পাঠক আর বইয়ের বিষয় বস্তুর জোর থাকলে প্রকাশক লাগে না। যেমন: কোমড়ে জোর থাকলে প্রিয়ার জন্য গার্ড বসাতে হয়না। তাই বিষয় বস্তু ভাল হলে ও আর আপনার উদ্যোক্তার মানসিকতা থাকলে প্রকাশক না হলেও চলে। চাষি বাজারে চাষিরা যেভাবে ডাইরেক্ট নিজের উৎপাদিত সবজি বিক্রি করে তেমনি আপনি আপনার বইটি ডাইরক্টি বিক্রি করবেন। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, মার্কটোয়েন নিজের বই নিজে ছাপাতেন ও বিক্রি করতেন। তিনি তার সময়কার সবচেয়ে ধনী ও সফল লেখক ছিলেন। আমাজন বেস্ট সেলারের বেশীর ভাগ বইই এখন সেলফ পাবলিশড। আমি নিজে একজন দক্ষ প্রযুক্তিবিদ। আমার সাথে অনেক সহায়তাকারী আছে। আমি মনে করি আমি নিজেই সেলফ পাবলিশিং এ বিপ্লব ঘটাতে পারব ইনশাল্লাহ।
সেদিন হয়ত বেশী দূরে নয় যেদিন সেলফ পাবলিশ লেখকরা লজ্জায় মুখ লুকাবে না। বরং প্রকাশকের টাকা দিয়ে যারা বই ছাপিয়ে প্রকাশকের সো কল সন্মানী বা "দয়া করে যা দেয়" তা নিয়ে চলছেন সে সমস্ত লেখকরা লজ্জা পাবে। সেলফ পাবলিশ লেখকরা বলবে, দেখ! আমার টাকা আছে। আমি সেলফ পাবলিশ করেছি আমি অন্যের টাকায় বই ছাপাই না। অন্যের দান খয়রাতে চলি না। নিজের টাকায় বই ছাপাই। নিজের প্রোডাক্ট নিজে বিক্রি করি। আমি নিজে উদ্যোক্তা "নপুংসক" নই। এভাবেই আমি গোটা বাংলাদেশের "ব্রাহ্মণ লেখক" আর "হরিজন লেখক"এর মধ্যে পার্থক্যটা কমাতে পারব। সেলফ পাবলিশ বা "সপুংশক লেখক" এরূপ নতুন আইডিয়াতে যেতে পারব। আর বেশী দুরে নয় যেদিন সেলফ পাবলিশ লেখকরা শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যারকে বলবে" আই এম এ সেলফ পাবলিশ রাইটার। আই এম আরনিং টেন লাক টাকা পার মান্থ হোয়াট এবাউট ইউ"।
পরিশেষে বলব পরনির্ভরতা পরিহার করে চলুন লেখক হিসাবে আমরা আমাদের বই "সেলফ পাবলিশ" করি।

Thursday, March 22, 2018

বাংলাদেশে পিডিএফ বইয়ের প্রচলন


বাংলাদেশে পি‌ডিএফ বা অনলাইন বই কি চলবে। অনেকের মত আমারও ধারনা ছিল, চলবে না।
আমার ধারনা বদল হ‌য়ে‌ছে। প্রথমে সুইডেন প্রবাসী আমার ক্যাডেট কলেজ বন্ধু আমার কাছে আমার বই “স্বনির্বা‌চিত কলাম,১ম খণ্ড”এর ই-বুক ভার্সন চায়। আমি প্রকাশক থেকে সর্বশেষ এডি‌টেড বই‌য়ের সফটক‌পিটা নেই। তারপর ফর্ম‌েটিং এর কিছু ঠিক ঠাক ক‌রে পি‌ডিএফ বইটি ইমেইলে বন্ধু‌কে পাঠাই। বন্ধু জানাল, ফন্ট ঠিক নাই। তারপর ফন্ট ঠিক করার যুদ্ধ কর‌ে সফল হলাম। আবার সৌ‌দি প্রবাসী, চায়না প্রবাসী দুইজন পি‌ডিএফ চাইল। একজন প্রবাসী আবার বাংলাদেশে অবস্থানরত মা‌য়ের মাধ্যমে বিকাশের করে ৬০ টাকা পাঠা‌তে চাইলেন। হার্ডকপি বইয়ের দাম ১০০ টাকা বইয়ের বেসিক খরচ ৪০ টাকা। তাই পিডিএফ এ ৬০ টাকা দিবেন চিন্তা করলেন। একজন যুবক বাংলাদেশে আছে। সে পি‌ডিএফ চাইল। আমি তা‌কে বললাম, তুমি বাংলাদেশে আছ। তুমি বই নি‌তে পার। পি‌ডিএফ নিবে কেন। সে জানাল পি‌ডিএফ পড়‌তে  তার ভাল লাগে। মোবাইলে পড়া যায়। পরে সে বিকাশে পেমেন্ট পাঠাল। বইয়ের দাম ১০০ টাকা বেসিক দাম ৪০ টাকা বাদে দাম ৬০ টাকা হল। বাংলাদেশের প্রকাশকরা ৩০% ডিসকাউন্ট দেয় সেই হিসাবে আরো ৩০ টাকা কম তাহলে পিডিএফ দাম ৩০ টাকা। আরো ৫ টাকা আমার পক্ষ থেকে কম ২৫ টাকা। পৃথিবী ব্যাপী পি‌ডিএফ বই ব্যাপক মার্কেট পাচ্ছে। আমাজন হ‌তে পেমেন্টে পি‌ডিএফ বই ক্রয় করা যাচ্ছে। আবার "প্রিন্ট বুক অন ডিমান্ডে"র মাধ্যমে বই প্রিন্ট করা যাচ্ছ‌ে। পি‌ডিএফ থেকেও হার্ডকপি বই করা যাচ্ছে।
বাংলা বই‌য়ের পি‌ডিএফ ভার্সন পড়াটা শহর ও গ্রামের অনেক ছেলেমেয়ে কাছে জনপ্রিয়তা পাচ্ছ‌ে। কয়েকদিন আগে ছেলেদের বললাম একুশে বই মেলায় তোমরা বই কিনবে কিনা। তারা বলল কিনব। তবে ডিজিটাল ফরমেটই ভাল। ইয়ং জেনারেশন সাড়ে পাঁচ বা ছয় ইঞ্চি ডিসপ্লের মোবাইলে বই পড়তে পাড়ছে। তাহলে সকল বইয়ের হার্ডকপি থেকে প্রথমেই পি‌ডিএফ ভার্সন করা প্রয়োজন। কারন পিডিএফ থেকে প্রিন্ট অন ডিমান্ডের মাধ্যম হার্ড কপি করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পাবলিশাররা তারা বিজয়ে অভস্থ্য। ইউনিকোড অভ্যস্ত নয়। তাই বিজয় থেকে ইউনিকোডে নেয়ার প্রয়োজন হয়। ইউনিকোডে নিকষ ফন্টে কাজটা করা যেতে পারে। নিকষ ফন্টটা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অফিশিয়াল ফন্ট। এটা বিজয় সুতনীর মত প্রফেশনাল লুক দেয়। অবশ্য বিজয়ে ইউনিকোড রয়েছে। যদিও প্রেসগুলি বিজয় ব্যতীত অন্যভাবে অভ্যস্ত নয়। এমনকি অনেক প্রেসে ইউনিকোডে ডকুমেন্ট করলে তা বিজয়ে করভার্ট করতে বলে। কারন প্রুফ রিডিংএ তারা বিজয়ে অভ্যস্ত। “সেলফ পাবলিসিং কনসেপ্ট” ও “প্রিন্ট বুক অন ডিমান্ড”এর জন্য বইয়ের পিডিএফ ভার্সন করাটা অতি জরুরী।

আপনার বই আছে। আপনি আপনার বইয়ের সফটকপি বিজয়ে থাকলে তা ইউনিকোডে কনভার্ট করে নিন। পিডিএফ কাউকে আপনি পেমেন্টে দিলে তার ব্যবহার সীমিত করার জন্য পাসওয়ার্ড দিতে পারেন। আপনি নিজেই অফিস ২০১৬ এর মাধ্যমে সেভ এজ পিডিএফ কমান্ড করে পাসওয়ার্ডসহ পিডিএফ ভার্সন করতে পারেন। যখন কেউ পিডিএফ চাইবে আপনি ভিন্ন ভিন্ন পাসওয়ার্ড দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিকে পিডিএফ বই দিতে পারেন। পিডিএফ করার সময় ডকুমেন্টে কে পিডিএফ কিনেছে তার ঠিকানা,ফোন নম্বর ও ইমেইল দিয়ে পিডিএফ করে দিতে পারেন। তাতে অবশ্য অনলাইনে আপলোড ও অনধিকার ব্যবহার কম হবে।
কোন বই প্রকাশনার শুরুতে পিডিএফ করলে প্রিন্ট অন ডিমান্ডের প্রক্রিয়ায় যখন যত কপি তা করা যাবে। বাংলাদেশের প্রকাশকরা আমাজন, ক্রিয়েটস্পেস, লুলু ইত্যাদির আদলে বইয়ের অনলাইন প্রকাশনা করতে পারেন আর আমার মত সেলফ পাবলিশ লেখকরা গ্রাহকদের ইমেইল বা অন্য কোনভাবে পাসওয়ার্ড দিয়ে পেমেন্ট পিডিএফ ফাইল পাঠতে পারেন।
পিডিএফ পাবলিকেশন এখন সময়ের চাহিদা। এটা না হলে প্রবাসী বাংলাদেশীরা পিডিএফ ভার্সন চাইত না আর আমকেও পিডিএফ ভার্সন বানাতে হত না। দেশেও চাহিদা হচ্ছে। তবে অনেকে ধারনা করছেন পিডিএফ ভার্সন হার্ডকপি বিক্রি কমিয়ে দিবে। তবে হার্ডকপি বিক্রি বেশী কমবে না। অল্প কমবে। অনেক পাঠক পিডিএফ অপেক্ষা হার্ডকপি বেশী পছন্দ করেন।

Thursday, March 15, 2018

ডিজিটাল যুগে বইয়ের মুদ্রণ কমা‌নো ও পরিবেশ রক্ষা

আপনি শহরের কোন লাইব্রেরী‌তে যান দেখবেন লক্ষাধিক বই আছে। প্রতিদিন পাঁচ ছয় জন পাঠক আসে। অথচ আজ থেকে ২০/২৫ বছর আগেও লাইব্রেরীতে প্রচুর মানুষ দেখা যেত। অনেক বই আছে বছরের পর বছর কেউ পড়ে না। অনেক লাইব্রেরী‌তে প্রতিবছর সরকারীভাবে বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বরাদ্ধ থা‌কে। নতুন বই কেনা হয়। নতুন বই কেনার পর অনেকে বই উল্টিয়েই দে‌খে না। পড়া তো দূরে থাক। আগে মানুষের সময় ছিল। মানুষ বই পড়ত। এখন মানুষ বই খুব কম পড়ে। কোন কিছু জান‌তে হলে গুগল থেকে তথ্য নেয়। আমরা কোন তথ্য জানার জন্য গোটা বই উল্টাতাম। এখন আর তা কর‌তে হয় না। গুগল সব তথ্য দি‌য়ে দেয়। প্রায় সেই সাথে  সাথে অডিও ভিজুয়াল ইউটিউব লিংকসহ। ফলে ছাপা‌নো বইয়ের প্রয়োজন কমে গেছে। ছাপা‌নো বই‌ পড়া কমে গেছে। যদি ডিমান্ড কমে থা‌কে তবে আমাদের সাপ্লাই কমিয়ে দি‌তে হবে। তাহলে বই ছাপা‌নোর কাজটা আমরা ডিজিটাল ক‌রে ফেল‌তে পারি। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটা দৈনিক পত্রিকা ঢাকার বাইরে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর থেকে প্রিন্ট হচ্ছে। একই ভাবে অনলাইন আর্কাইভ থেকে পাঠকের ডিমান্ড অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি‌টি জেলা বা উপজেলা থেকে বই বের হ‌তে পা‌রে। সেখানেই প্রিন্ট হবে। সেখান থেকে চাহিদাকারীর কাছে চলে যাবে। এতে আমরা চাহিদার বাইরেই অপ্রয়োজনীয় বই‌য়ের প্রিন্ট বন্ধ কর‌তে পারব। প্রতি‌টি লাইব্রেরী পাঠক থেকে চাহিদা নি‌য়ে‌ বই প্রিন্ট ক‌রে দিবে। ডিজিটাল বই অনলাইনে সব সময় মজুদ থাকবে। মোবাইল ডিভাইস, কম্পিউটার ও ল্যাপটপে যখন যার ইচ্ছে  পড়‌তে পারবে। শুধু বই করার প্রয়োজন হলে ঢাকা নীল ক্ষেতের মত কম্পিউটার ও রঙ্গিন প্রিন্টার নি‌য়ে‌ পার্টি প্রস্তুত থাকবে। চাহিদা অনুযায়ী প্রিন্ট ক‌রে হোম ডেলিভারি দিবে। গতানুগতিক প্রিন্টিং  থেকে খরচ বেশী গেলেও এতে আমরা অপ্রয়োজনীয় বই‌য়ের প্রিন্টিং কমা‌তে পারব।
বইয়ের বিক্রি বাড়ানোটা অনেকটা অসম্ভব। মানুষ ডিজিটাল ফরমেটে বই পড়তে দিনে দিনে দক্ষ হয়ে যাচ্ছে। আমার মনে আছে আগে আমি মোবাইল বা কম্পিউটারে বই পড়তে আগ্রহী ছিলাম না। কাগজের বই পড়তে অনেক কমফোর্ট লাগত। ধীরে ধীরে ফেইসবুক মোবাইলে পত্রিকা পড়তে পড়তে ডিজিটাল ফরমেট অনেকটা প্রয়োজনীয় উপাদান হয়ে গেছে। এখন বরং কাগজের বই থেকে ফন্ট সাইজ বড় ছোট করার কারণে মোবাইলে পড়াটা এখন মন্দ নয়। অন্য লাইন পত্রিকাগুলো মোবাইলে ব্যাপকভাবে পড়া হচ্ছে। কলাম আকারে বড় ফন্টে ডিজিটাল বই পড়তে মন্দ নয়। আবার বাজারে নতুন পুরাতন প্রায় সকল বই পিডিএফ ফরমেটে আছে। আমরা যদি ডিজিটাল ফরমেটে পড়তে অভ্যস্ত হই তবে কেন আমরা প্রিন্ট বই রাখব। টাকা ডিজিটালই ট্রান্সফার হচ্ছে তবুও সিনিয়র সিটিজেনরা কাগজের টাকা পছন্দ করবে। যদি স্মার্ট ফোনের বদৌলতে গ্রামে গঞ্জে সকল ছেলে মেয়ে মোবাইলে ম্যাসেজ পড়া, তথ্য পড়া ইত্যাদিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে তবুও স্কুল ও কলেজে বইয়ের অনুশীলন থাকবে। হয়ত বৃদ্ধ বয়সে বই আমরা বেশী পছন্দ করব। আমরা অবশ্য বাজারে দেখতে পাই বই এখন আগের চেয়ে কম প্রিন্ট হচ্ছে। এই প্রিন্টটা কখনো ৫০০ বা ১০০০ কপি আকারে প্রিন্ট হয়। আমরা এই প্রিন্টটাকে প্রেসে না রেখে স্থানীয় ভাবে চিন্তা করতে পারি। এই কারণে পত্রিকার মত বিভিন্ন স্থান হতে প্রিন্টিং ভাবনা। এতে বই সরাসরি এক স্থান হতে অন্য স্থানে পাঠানোর খরচ কমে যাবে। দিনকে দিন রঙ্গিন প্রিন্টের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। এখনকার প্রিন্টারে রঙ্গিন প্রিন্ট প্রায় প্রফেশনাল প্রিন্টের কাছাকাছি
আমার প্রস্তাবে বই প্রিন্ট হবে উপজেলা পর্যায়ে। ঢাকায় প্রিন্ট হবে আর তা সারা দেশে পরিবহন করা হবে। অনলাইন আর্কাইভ থাকবে। সেই আর্কাইভ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী বই ছাপানো হবে। অনর্থক কোন বই ছাপানো হবে না। এতে পাঠকের কাছে একটা চয়েস থাকবে। হয় তিনি ডিজিটাল ফরমেটে পড়বেন। অন্যথায় প্রিন্ট করে পড়বেন। প্রতিটি উপজেলায় ডিজিটাল লাইব্রেরি ও প্রিন্টিং স্টেশনে থাকবে কম্পিউটার, উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন প্রিন্টার ও আধুনিক বই বাধাই করার ব্যবস্থাদি।

আমার এই পদ্ধতিটিতে অনেক প্রকাশক নিজেদের আধুনিকায়নের জন্য কাজে লাগাতে পারবেন বলে আমি মনে করি।

Thursday, March 8, 2018

উদীয়মান লেখকদের লেখনী উন্নয়ন ও প্রচারণায় জন্য উদীয়মান লেখক ফোরাম


যারা উদীয়মান লেখক তারা দিন রাত কবিতার পংক্তি চিন্তা করে। কবিতা লেখে। গল্প লেখে। কখনোও কখনো উপন্যাস লেখারও চেষ্টা করে থাকে। তাদের সবার স্বপ্ন থাকে বই প্রকাশ করা। জাতীয় পর্যায়ে যাওয়া। সবাই যেন জানতে পারে। সবাই যেন লেখক হিসাবে তাকে চিনে। সবাই হয়ত এক ভাবে আগাতে পারে না। কেউ দ্রুত ভাল সাহিত্যিক হয়ে যায়। কেউ হয়ত ধীরে ধীরে আগায়। কেউ হয়তবা কিছু লেখা লেখি করে অন্য প্রফেশনে চলে যায়।
সবাই তাদের কাজের প্রতিফলন হিসাবে বই ছাপাতে চায়। এজন্য তারা বিভিন্ন লেখকের কাছে যায়। যারা বই প্রকাশ করেছে। তাদের পরামর্শ নেয়। বর্তমানে পৃথিবীর অনেক পত্রিকা পিডিএফ ফরমেটে বাজারে পাওয়া যায়। পিডিএফ ভার্শন অনলাইনে ক্রয় করা যায়। এখন অনেক পাঠক আছেন তারা কেবল মোবাইল বা ট্যাবে বই পড়েন। এই ধরনের পাঠকের জন্য পিডিএফ ভার্সনে বই রাখতে হবে। বরং তারা হার্ড কপি বই সাথে বহন বিরক্ত মনে করে। তথাপিও হার্ড কপি বই এখনও আমাদের বাংলাদেশের লেখকদের স্বপ্ন। হয়ত আরও দশ বছর আমরা হার্ড কপি বই পছন্দ করব। তারপর আমরাও আমেরিকান বা ইউরোপিয়ানদের মত ধীরে ধীরে ডিজিটাল ফরমেটে চলে যাব।
যতদিনে আমরা ডিজিটাল ফরমেটে না যাচ্ছি আমাদের বই প্রকাশ চলতে থাকবে। বই প্রকাশনা করতে একজন প্রকাশকের বেশ মূলধনের প্রয়োজন হয়। সকল প্রকাশক আবার ব্যবসা সফল না। বেশীর ভাগ প্রকাশকই তাদের পুঁজি ও ব্যবসা ঠিক রাখতে নোট, গাইড ও এইচএসসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত বই প্রকাশনা করে বেচে থাকে। এভাবে বাংলাদেশ হাজার হাজার প্রকাশক নিজেদের লাইভ সাপোর্ট নিয়ে বেচে আছে। যে সব প্রকাশক লাইভ সাপোর্ট নিয়ে বেচে থাকে তারা আবার নতুন লেখককে কিভাবে সাপোর্ট দিবে। তাদের কাছে কোন পাণ্ডুলিপি নিয়ে গেলে সাধারণত দেখা যায় পাণ্ডুলিপিটি পড়ে ছাপানোর উপযোগী কিনা সেটা বিচার করার কোন ব্যবস্থা নেই। তারা যেটা করে এডিটিং এর নাম করিয়ে লেখক থেকে পয়সা নিয়ে কিছু পেশাদার লোকদের দিয়ে লেখাটি চেক করিয়ে নেয়। পেশাদার এডিটর লেখাটি দেখে প্রকাশককে এক ধরনের মূল্যায়ন দেয় তা মূলত: ব্যবসায়িক মূল্যায়ন। বইটি বাজারে কেমন চলতে পারে। বই টি কতটুকু চলতে পারে। এই হিসাবের উপর নির্ভর করে তারা নতুন লেখকদের সাধারণত পুরোটাই পেমেন্ট করিয়ে ছাড়ে। ইউরোপ আমেরিকার মত আমাদের দেশে কোন প্রকাশনা অনলাইন ভার্সন রিলিজ করে বলে আমার জানা নাই। এই অনলাইন ভার্সনের সাথে আবার অডিও বই রিলিজ করা হয়। এভাবে প্রসারটা হয়।
প্রতিটি ধাপে পয়সা খরচ হয়। প্রকাশকরা নতুন লেখকদের জন্য কোন রিস্ক নেন না। ব্যবসা অসফল বা সফল হওয়ার দায়িত্বটা ছেড়ে দেয় লেখকের কাছে। লেখক নিজের পকেটের টাকা খরচ করে খায়েশ মিটায়। এতে কেউ সফল হয়। কেউ হয় না।
সকল উদীয়মান লেখকরা জীবনের প্রতিষ্ঠার শুরুতে কি সেই সব প্রকাশক ব্যতীত কোন ফোরাম করতে পারে। সেই ফোরামে উদীয়মান  লেখকরা যোগ দিবে। তারা সমস্ত জেলা/উপজেলায় ছড়িয়ে থাকবে। তারা তাদের অবস্থান থেকে তাদের লেখা শেয়ার করতে থাকবে। তাদের কার্যক্রম হবে ভার্চুয়াল অফিস ও ভার্চুয়াল লাইব্রেরীর মাধ্যমে। তারা তাদের লেখাগুলো ফোরামের ব্লগের মাধ্যমে শেয়ার করবে। সেখানে তাদের লেখাগুলো লেখক ফোরামের লেখকরা পড়বে। তারা একটা মতামত দিবে। উন্নয়নের জন্য দিক নির্দেশনা দিবে। ফোরামের কোন সদস্য ভলান্টারী কোন লেখা এডিটিং করে দিবে।  এডিটিং এর পর তা আবার উদীয়মান লেখকের কাছে যাবে। লেখক গ্রহণযোগ্য এডিটিং নিয়ে তার বই চূড়ান্তভাবে পিডিএফ ভার্সন করবে। স্থানীয় কম্পোজারের সহায়তায় সে কম্পোজ করবে বা ফোরামের কারো ভালান্টারী সহায়তা বা পেমেন্টে কাজটা করবে। পিডিএফ ভার্সন ডাউন লোডের জন্য ওয়েব সাইটে থাকবে। সকল ফোরাম মেম্বার বা অন্য পাঠকরা সেই ওয়েব সাইট হতে পেমেন্টে পিডিএফ ফাইল ডাইন লোড করবে। কোন কোন ফেরাম মেম্বার ডাউন লোড করবে তার তালিকা প্রদর্শিত থাকবে। লেখক পেমেন্টে ডাউন লোড করার পর টাকাটা তার একাউন্টে জমা হবে প্রাথমিক পুঁজি হিসাবে।
এই পুঁজি দিয়ে লেখকের হার্ড কপির ভার্সন মেলার জন্য বা পাঠক চাহিদার উপর প্রিন্ট করে দেয়া হবে।

এটায় সমাজের বিত্তবান থেকে ডোনেশন গ্রহণ করার ব্যবস্থা  থাকবে। এমনকি ভাল বইগুলির জন্য ডোনারের বিঞ্জপ্তি দেয়া হবে। ফোরামের লেখকদের তাদের এলাকা বা উপজেলা হতে পাঠক লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব থাকবে।
এই ধরনের ভার্চুয়াল অফিস কোন স্থাপনা ছাড়া অনলাইনে মেনটেইন করা যায়। এতে পুরো প্রক্রিয়ায় তেমন কোন খরচ পড়বে না। এভাবে দ্রুত একজন নব্য লেখককে প্রফেশনাল লেখক তৈরি করে দেয়া যাবে। লেখক একটা শিক্ষামূলক প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকবে। সে ক্রমান্বয়ে লেখনীর উন্নয়ন করতে পারবে। লেখার উন্নয়নে দিক নির্দেশনা পাবে সবার সহযোগিতা পাবে। এই ফোরাম ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভার্চুয়ালী সারা দেশের সমস্ত উপজেলায় ও পরবর্তীতে ইউনিয়ন পর্যায়ে কানেকটেড থাকবে। এই ফোরামের মূল লক্ষ হল একটা নব্য লেখকের টাকা খরচ না করিয়ে তার বই প্রকাশনায় সহযোগিতা করা। নব্য লেখকদের নিজের টাকায় বই প্রকাশের মত হয়রানীমূলক অবস্থা থেকে পরিত্রাণ করা।

Thursday, March 1, 2018

উদীয়মান লেখক ফোরাম


বাংলাদেশের শতকরা ৯৮% উদীয়মান লেখক নিজের টাকায় বই ছাপায়। এটা হল বাস্তবতা। কারণ প্রকাশক বই বিক্রয় করতে পারে না। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে যত বইয়ের লাইব্রেরী আছে তাদের কাছে স্কুল কলেজের পাঠ্য বই, নোট ও গাইড বই ছাড়া আর কোন বইয়ের বিক্রয় বা বিপণন হয় কিনা সন্দেহ। রেফারেন্স বা স্টোরী বুক এখন কমই বিক্রয় হয়। এই বিক্রয় কি আর বাড়ানো যাবে। আমি আশাবাদী নই। কারণ ডিজিটাল অগ্রগতি আমাদের মেনে নিতে হবে। অনেক দেশের হার্ড কপি ভার্সন লস দিতে দিতে এক সময় বন্ধ হয়ে গেছে। আমি নিজেও বেশ কয়েক বছর কোন পত্রিকা ক্রয় করছি না। অনলাইন বা ডিজিটাল ফরমেটে পড়ছি। এটাই হয়ত আধুনিক কালচার। এই কালচার থেকে বের হওয়ার উপায় নাই। আমাদের নতুন অবস্থার সাথে তাল খাইয়ে নিতে হবে। তাই প্রয়োজন উদীয়মান লেখক ফোরাম। একজন উদীয়মান লেখকের প্রথম সাপোর্ট হল তার জন্য লস না হয় সেটা বিবেচনায় আনা। কিছু আর্থিক ইনসেন্টিভ দেয়া। যদিও লেখকদের বইয়ের সাইজ নির্দিষ্ট করা সমীচীন নয় তথাপিও কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ সম্ভব হলে ছোট ভাবে শুরু করাটা মন্দ নয়। নীচে উদীয়মান লেখকদের সাজেস্টেট একটা আকৃতি দেয়া হল।
১। বই চার বা আট ফর্মা।
২। মূল্য হতে পারে ১০০/১৫০/২০০ টাকা
৩। বোর্ড  বাধাই
৪। অফসেট

উদীয়মান লেখক ফোরামটা কিভাবে চালনা করা যেতে পারে। তার জন্য কিছু সাজেশন নীচে তুলে ধরলাম:
১। প্রতি উপজেলায় লেখক বের করতে হবে।
২। প্রতি লেখকের দুইটি করে বই প্রতি উপজেলায় বিক্রয়ের ব্যবস্থা করবে।
৩। এক লেখক অন্য লেখকের লেখনী উন্নয়ন করবেন ও মান উন্নত করবেন।
৪। একজন অন্যজনের লেখা সম্পাদনা করে দিবেন।
৫। প্রচ্ছদ আইডিয়া ও প্রচ্ছদ কম্পোজ করে নিবে এই জন্য উদীয়মান লেখক ফোরাম চাহিদা করবে। লেখকদের লিংক আপে সেই  চাহিদা অনুযায়ী প্রচ্ছদ শিল্পী হান্ট করা যাবে।
৫। প্রত্যেকটা বই ওয়ার্ড ফাইলে কম্পোজ করে তা পিডিএফ ফাইল ফরমেট করা হবে।
৬। পিডিএফ প্রিন্ট ও কাভারের জন্য রঙ্গিন প্রিন্টের সহায়তা নিবে ও বই বাধাই হবে।
৭। প্রতিটি উপজেলার উদীয়মান লেখকরা একটি করে বই লাইব্রেরীতে প্রদর্শনের জন্য রাখবে।
৮। উদীয়মান লেখকের বই পিডিএফ ভার্সন ও হার্ড কপি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনীতে বিনা পয়সায় ছাপানোর চেষ্টা চালানো হবে। যদি অন্য কোন প্রকাশক বিনে পয়সায় ছাপাতে রাজি না হয় তবে নব্য লেখক ফোরাম সেই বই প্রকাশনার দায়িত্ব নিবে।
৯। নব্য লেখক ফোরাম অন্য প্রকাশনা দ্বারা রিজেক্টেড লেখকদের বই প্রথমে মান উন্নয়নের জন্য প্রফেশনাল সম্পাদকের কাছে দিবে। সেখানে লেখার মান উন্নয়নে প্রচেষ্টা চালানো হবে।
১০। প্রফেশনাল দ্বারা সম্পাদনার পর লেখককে প্রি বুকিং করে বইয়ের সংখ্যা নিরূপণ করে নিতে বলা হবে। বইয়ের সংখ্যা চূড়ান্ত করার পর বই প্রিন্ট করা হবে। এখানে বইয়ের প্রি বুকিং গুরুত্ব পূর্ণ হবে। কারণ লেখক যেন বেশী বই ছাপিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয় তা লক্ষ রাখা হবে। বই যেন অবিক্রীত না থাকে সেটা লক্ষ রাখা হবে।
১১। নব্য লেখকের সবচেয়ে শক্তিশালী বিষয় যেটা করা হবে তা হল বইয়ের নেটওয়ার্ক মার্কেটিং। প্রতিটি উপজেলায় অন্তত দুইটি করে বই বিক্রির জন্য উদীয়মান লেখকরা দায়িত্ব নিবে।

উদীয়মান লেখকদের করনীয়:
উদীয়মান লেখক ফোরা‌মের লেখক‌দের করনীয়:
১। উদীয়মান লেখকরা তা‌দের পরিচিত কারা কারা বই নিয়মিত পড়েন তার তালিকা তৈরি করবে। কারা কারা কি ধরনের লেখা পড়েন তার তালিকা রাখবেন।
২। কারা কারা তার বই কিনতে আগ্রহী তার তালিকা রাখবে।
৩। নতুন লেখকরা নিজ উপজেলায় বা জেলায় এক বা একাধিক লাইব্রেরীর শপের সাথে যোগা‌যোগ করবে যা‌দের মাধ্যমে নতুন লেখক‌দের বই প্রচার ও বিপণন করা যায়।
৩। নব্য লেখকরা জন্মদিন ও বি‌য়ে জাতীয় সামাজিক অনুষ্ঠানে তার নিজের প্রকাশিত বই বা উদীয়মান লেখক ফোরা‌মের বই উপহার দিবে। কারণ যে কেউ বাজা‌রে গেলে নামী/দামী লেখকের বই কিনে। সাধারণত নতুন লেখকের বই কেউ কিনে না। তাই সামাজিক দাওয়াতের যেখানেই গিফট দেয়া হবে সেখানে নতুন লেখকরা উদীয়মান লেখক ফোরা‌মের বই গিফট দিবে।
৪। উদীয়মান ফোর‌মের লেখকরা পরস্পর পরস্পরের বই‌ পড়বে। পরস্পর পরস্পরের বই‌য়ের মান উন্নয়নের জন্য গোপনীয়তার সাথে ক্রিটিকস করবে।
৫। উদীয়মান লেখকরা পরস্পর পরস্পরের  লেখা সম্পাদনের  দায়িত্ব নিবে।
৬। কেউ ভাল প্রচ্ছদ কর‌তে পারলে অন্য‌দের প্রচ্ছদ কর‌তে সহায়তা করতে হবে।
৭। কেউ কম্পোজ জানলেও উদীয়মান লেখক‌দের মধ্যে পরস্পর সহ‌যোগীতা করবে।
৮। উদীয়মান লেখক ফোরা‌মের কার্যক্রম প্রাথমিক ভাবে ভার্চুয়ালী সামাজিক যোগা‌যোগ বিভিন্ন এ্যাপের মাধ্য‌মে করা হবে।

Wednesday, February 28, 2018

কংগোর এ্যাভেবা ক্যাম্প ও রক্তারক্তির খেলা


ব্যানব্যাট-১/১১ গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১১ কঙ্গোতে এক বছরের জন্য মোতায়েন ছিলবাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি চৌকষ ইউনিট ১১ ইষ্ট বেঙ্গলইউনিটটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে সাভার সেনানিবাস হতে অফিসার, জেসিও সহ সর্বমোট ৮৫০ জন সেনাসদস্য ব্যানব্যাট-১/১১ হিসেবে কঙ্গোতে গমন করে

ব্যানব্যাট-১/১১ মোতায়েনের স্থানগুলো ছিল কঙ্গোর ওরিয়েন্টাল প্রদেশের ইতুরী জেলার বগোরো, এ্যাভেবা, বুকিরিংগী, মারাবো ও কমান্ডা’য়। বুকিরিংগি ক্যাম্পে দুইটি প্লাটুন ছিল।অন্য চারটি স্থানে চারটি কোম্পানী জনবলে ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর ছিল বুনিয়া শহরের এ্যান্ড্রোমো ক্যাম্পে মিশনটির নাম ছিল “মনুষ্ক” মিশনটি দীর্ঘদিন ধরে চলমান।



আমি এই মিশনে ১১ ইষ্ট বেঙ্গলের সাথে ব্যানব্যাট-১১ সদস্য হিসাবে গমন করি। আমার নিযুক্তি ছিল কঙ্গোর বুনিয়া ব্যাটালিয়ন হেড কোয়ার্টারের “সাপোর্ট কোম্পানি কমান্ডার” হিসাবে। সাপোর্ট কোম্পানি কমান্ডার হিসাবে আমার আর একটি বাড়তি কাজ হল যখন যেই কোম্পানি কমান্ডার ছুটি যায় তার স্থলাভিষিক্ত হওয়া এই করে আমার ব্যানব্যাটের সকল কোম্পানির ক্যাম্পে প্রতিটিতে মাসাধিকাল করে থাকা হয়ক্যাম্পের জীবনে অপারেশন চ্যালেঞ্জ বেশী। রুটিন কাজের চাপ অনেক কম।
এই রূপ একটি রোটেশানে মেজর (২০১৮ সালে লে: কর্নেল) মাহি’র স্থানে এ্যাভেবা ক্যাম্পে আমাকে আসতে হল। ক্যাম্পটিতে এর আগে কয়েকবার বুকিরিংগি নামক একটা ক্যাম্পে যাওয়া ও আসার পথে গিয়েছি। বুকিরিংগি অনেক ভিতরে দুর্গম ক্যাম্প। কাঁচা রাস্তায় গাড়ী চলিয়ে যেতে হয় ঘণ্টা ২০/২৫ কি:মি: এর বেশী গতিতে যাওয়া যায় না। আকা বাঁকা বিপদজনক রাস্তা।

এ্যাভেবা ক্যাম্পটি একটি ছোট পাহাড়ের উপর তৈরি করা হয়েছে। ক্যাম্পটি থেকে আসে পাশের এলাকা সুন্দরভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়। মিশনের অনেক আগে থেকেই এই এলাকায় মিলিশিয়াদের অনেক পদচারণা ছিল। মাঝে মাঝে ওরা এক দুইবার দূর থেকে এক দুই রাউন্ড ফায়ারও করে পালিয়ে যায়ক্যাম্প কখনও ফায়ার ব্যাক করে ফায়ারের উত্তর দেয়। আর মাঝে মাঝে পর্যবেক্ষন করে। উত্তর দেয় না। কোম্পানি কমান্ডার মেজর মাহি’র ছুটি যাওয়ার আগে বলে গেল, “আপনাকে একটা হট সিচুয়েশনে ফেলে যাচ্ছি। আশা করি আপনি ব্যস্ত থাকবেন”
এ্যাভেবা ক্যাম্পটা দেখতে সুন্দর। তখনো সেখানে প্রিফেব করিমেক লাগানো হয়নি। আমাদের আগের ইউনিটগুলো টিন শেড করে গেছে। তবে সৈনিকদের জন্য তাঁবু ছিল। তাবুতে এক বছর কাটানোটা বড়সড় একটা চ্যালেঞ্জ। ক্যাম্পের পানির উৎসটা আবার ভাল ছিল। অনেক ক্যাম্পে ওয়াটার ব্রাউজার দিয়ে ক্যাম্পের বাইরে হতে পানি আনতে হত। এতে ক্যাম্পের বড় একটা সময় ও জনবল পানি আনতে নিয়োজিত থাকত। সেই হিসাবে ক্যাম্পটি আরামের। নীচে ঝরনা থেকে সাব মার্সিবল পাম্পের সাহায্যে ক্যাম্পে পানি তোলা হত। একটা বড় ট্যাংকে মজুদ করা হত সেখান থেকে ছোট পাম্পে পানি আবার  সৈনিক বাসস্থানে আর কুক হাউজে নেয়া হত। ক্যাম্পের পাশেই বিশাল মাঠ ছিল এই মাঠে হেলিপ্যাড তৈরি করা ছিল। আমরা সেখানে মাঝে মাঝে স্থানীয় কংগোলীজদের সাথে বা কংগোলীজ আর্মির সাথে এই মাঠটিতে ফুটবল খেলতাম। ক্যাম্পটার চারিদিকে পাহাড় দ্বারা ঘেরা থাকায় সিনিক বিউটি অনেক অনেক সুন্দর ছিল।
কঙ্গোর মিশনটাই আগাগোড়া একটা চ্যালেঞ্জের মধ্যে ছিল। আমি যেই ব্যাটালিয়নের লোকেশনে ছিলাম এই একই লোকেশনে ২০০৫ সালে ২৫ ফেব্রুয়ারী ক্যাপ্টেন আসাদসহ ৯ জন কমান্ডো শাহাদাত বরন করেছিল। এই ব্যাটালিয়নের সাথে প্রায় ১৫০ জন কমান্ডো থাকে। আমার এই এ্যাভেবা ক্যাম্পেও কমান্ডো ছিল। তারা টহলের সাথে নিয়মিত টহলে যেত। কঙ্গোর লোকজনের সাথে সম্পর্কটা ভাল ছিল। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ভাষাগত ব্যবধান। ওরা স্থানীয় ভাষা সিংহলী ও ফ্রান্স ছাড়া ইংরেজি বুঝত না। তাই ইন্টারপ্রেটার ছাড়া ওদের সাথে যোগাযোগের কোন মাধ্যম ছিল না। জনসাধারণের সাথে “সুপ্রভাত” বলা ছাড়া আর কোন যোগাযোগ করা যেত না। ইন্টারপ্রেটার বেশীরভাগ ছিল কংগোলীজ। তারা কতটুকু সহি বা নির্ভুল ভাবে আমাদের কথা ইন্টারপ্রেট করত তা অনেকটাই ডাউটফুল থাকত। কারণ আমাদের সুন্দর কথায় স্থানীয়দের  তেমন সন্তুষ্ট হতে দেখা যেত না। আমি ২০০২ সালে সিয়েরালিয়নে আর একটি মিশন করি এই মিশনে আমরা স্থানীয়দের সাথে রাস্তায় গাড়ী থামিয়ে কথা বলতাম। ওরাও সমস্যা থাকলে জানাত। ইন্টারপ্রেটার লাগত না। বিশাল একটা ভাল লাগার অনুভূতিতে আমরা ছিলাম। আর কঙ্গো মিশনে নিজেদের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বাসিন্দা মনে হত। তবুও যতটুকু সম্ভব ইন্টারপ্রেটার নিয়ে সর্বোচ্চ মাত্রায় আমরা যোগাযোগ করার চেষ্টা করে যেতাম। ফলাফল ভাল ছিল। কিন্তু অনেক বেশী তাদের সাথে আন্তরিক আমরা কখনো হতে পারিনি। এটা ছিল মিশন টাইমের সবচেয়ে বড় “ড্র ব্যাক”আর এই “ড্র ব্যাক” আমাদের বেশ কিছু ক্যাজুআলটির কারণ থাকতে পারে বলে বলে ধারনা করা যায়। ভাষার বেরিয়ার না থাকায় সিয়েরালিয়নে যত তাড়াতাড়ি আপন হওয়া গেছে তত তাড়াতাড়ি তাদের সাথে আপন হওয়া যাচ্ছিল না। সময় বেশী লাগছিল। সিয়েরালিয়নে বাচ্চাদের সাথে সবচেয়ে মজা হত বাচ্চারা আমাদের দেখলে বলত, “বাংলা গিভ মি চপ চপঅর্থাৎ “বাংলা আমাদের খাবার দাও”এখানে এই ধরনের কোন আর্জি নাই। কথা বলতে হলে ইন্টারপ্রেটার ডাক। তারপর কথা বল। মোটামুটি মহা যন্ত্রণার বিষয় বলা যায়। আমরা কঠিন ধৈর্য ধরে তা ওভার কাম করি। তাদের ফুটবল কিনে দিয়ে মহিলাদের সেলাই মেশিন কিনে দিয়ে। টিভি দিয়ে ক্লাবঘর তৈরি করে তাদের সাথে আমাদের কথাবার্তার ফারাকটা যতটুকু পারা যায় দূর করার ব্যবস্থা করি
কঙ্গোর সারা দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক দুর্বল। পাহাড়ের মাঝে রাস্তা কেটে কেটে তৈরি। বৃষ্টিতে অনেক সময় গাড়ী ফেঁসে যায়। তবে আমরা এপিসি নিয়ে চলাচল করায় কাদায় ফাঁসায় ভয়টা কম থাকতছোট গাড়ীগুলি সহজেই কাদায় ফেঁসে যেততখন এপিসি দিয়ে এই ছোট গাড়ী গুলি তুলতে হত। আমি টহলে গাড়ী ফেঁসে যাওয়ার এরূপ যন্ত্রণায় পড়েছি। মাঝে মাঝে এদের সিভিল ট্রাক আটকিয়ে গেলে আমরা তুলে দিতাম। কারণ ওই ট্রাককে না তুলে দিলে আমাদের নিজেদের যাতায়তই বন্ধ হয়ে যেতকঙ্গোর বুনিয়া টাউনে বাংলাদেশের ব্রিগেডের সদর দপ্তর ছিল। এই ব্রিগেডের দুইটি বাংলাদেশী ব্যাটালিয়ন ছিল। একটি মরক্কান ব্যাটালিয়ন ও একটি নেপালের ইঞ্জিনিয়ার কোম্পানি ছিল। ব্রিগেডের লজিস্টিক এরিয়া ছিল আমাদের এই বুনিয়া ক্যাম্পটি। সপ্তাহে দুইদিন। সোমবার আর বুধবার মুভ থাকত। ওই মুভে আমরা  লজিস্টিক দূরের ক্যাম্পে পাঠাতাম।

যা বলছিলাম বুনিয়া ব্যাটালিয়ন হেড কোয়ার্টার থেকে ভারপ্রাপ্ত কোম্পানি কমান্ডার হয়ে কঙ্গোর “এ্যাভেবা ক্যাম্প”এ যাই। কং‌গোর এ্যা‌ভেবা ক্যাম্পে থাকাকালীন ২২ জানুয়ারী ২০১২ তারিখ বিকালে কয়েকজন স্থানীয় কং‌গোলীজ আমার সাথে দেখা কর‌তে চাইল। আমি তা‌দের ডাকলাম। ক্যাম্পের গোলঘ‌রে বসালাম। চা নাস্তা দেয়া হল। তারা স্থানীয় এক‌টি প্রতিষ্ঠানে কাজ ক‌রে। সংখ্যায় তারা তিনজন। তা‌রা এন‌জিওতে কাজ করছে। তাদের একজন ভাল ইংরেজি জানে। সে জানাল, সে সিয়েরালিয়নে চাকুরী করেছেতখন তার সাথে আমার ভাল গল্প জমে গেল। তার পরিবার উগান্ডায় রেখেছে। সেখানে বাচ্চারা পড়াশোনা করে। কঙ্গোতে লক্ষ্য করলাম এদের অনেকের পরিবার উগান্ডায় থাকে। কংগোলীজ ন্যাশনাল স্টাফ বিশেষ করে ইন্টারপ্রেটাররা তাদের পরিবার নিরাপত্তার জন্য উগান্ডায় রাখতে দেখা যায়। উগান্ডায় যাওয়ার সপ্তাহে চার দিন ফ্লাইট ছিল। তারা খুচ‌রো প্রসঙ্গ বাদ দি‌য়ে বলল, “একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দি‌তে এলাম। তোমরা সকাল দুপুর বিকাল ও রা‌তে টহল করছ। কিন্তু তোমা‌দের টহলের মাঝের গ্যাপে কিছু মিলিশিয়া ডাকাতি ও লুট করছে। তারা একেক সময় একেক এলাকায় যাচ্ছে। গত সপ্তাহে তারা প্রায় তিনদিন আক্রমণ করেছে তিনটি গ্রামে”তুমি কি আমা‌কে সময়টা বল‌তে পারবে। বলল, “রাত আটটা থেকে দশটা”কতদিন ধ‌রে চলছে? সে জানাল, “গত এক সপ্তাহে তিন চারটা ঘটনা ঘটেছে”আমি জায়গা গু‌লোর নামগু‌লো জেনে ম্যাপে মার্ক করলাম। আমি সেদিনই সন্ধ্যার টহলটার সময় পরিবর্তন করে ৭টার স্থলে ৮টা ক‌রে দিলাম। তবে এক ঘণ্টা হা‌তে রাখলাম। মূলত: বের হওয়ার ইচ্ছে  হল রাত ৯ টায়। এটা গোপন রাখলাম।  প‌রে ধী‌রে ধী‌রে সময় পেছাব। নয়ত গোপনীয়তা থাকবে না। টহল কমান্ডার হিসাবে আমি যাব জানিয়ে দিলাম।
রাত আটটায় টহল টুআইসি সু‌বেদার মুনির এসে বলল, “স্যার টহল রেডি”আমি বললাম, কিছুক্ষণ দেরী করব। টহল‌কে এপিসি থেকে নেমে টি‌ভি দেখ‌তে বলেন। আমি কিছুক্ষণ দেরী ক‌রে তারপর  টহল শুরু করব। এর মধ্যে আমার কং‌গোলীজ ইন্টারপ্রেটার দুপুর বেলা ছুটি নিয়েছে। সন্ধ্যার সময় ক্যাম্পে চলে আস‌বে। কং‌গোর দ্বিতীয় ভাষা হল ফ্রেঞ্চ। তারা ইংরেজি বো‌ঝে না। তাই ইন্টারপ্রেটার ছাড়া টহল করা সম্ভব নয়। নয়টা বেজে গেল। আমি আমার টহল টুআ‌ইসি সুবেদার মুনিরকে টহল গাড়ীতে মাউন্ট কর‌তে বললাম। সু‌বেদার মুনির বলল, “টহল গাড়ীতে মাউন্ট। ইন্টারপ্রেটার নাই”আমার বেশ রাগ হলবললাম,অপেক্ষা করুন সে আসুক৩০ মিনিট অপেক্ষা ক‌রেও সে আসছিল না। আমি ঘড়ির দি‌কে তাকিয়ে অস্থির হ‌য়ে বললাম, আর অপেক্ষা নয় চলেন। ট্যাংকের মত দুই এপিসি, আমার এক জীপ আর এক পিকাপ এফআর‌ডি‌সি অর্থাৎ কং‌গোলীজ আর্মির জন্য ছিল। জীপে আমি, আমার রানার, ড্রাইভার ও ইন্টারপ্রেটার নি‌য়ে চারজন। দু‌টি এপিসি‌তে আটজন ক‌রে ষোল জন। সর্বশেষ পিকাপ টি‌তে চালক ও চালকের পাশের সার্জেন্ট বাংলাদেশী পিকা‌পের বডিতে ৮ জন কং‌গোলীজ আর্মি ও এফআরডি‌সির সৈনিক।
টহল নি‌য়ে বেরুনোর পথে গেইটে হাঁপা‌তে হাঁপাতে এসের ইন্টারপ্রেটার হাজির। আমি মূখভর্তি ইংরেজি গালি তার উপর ঝাড়লাম। সে বলল দেরী করার কারণ "লু‌টিং ইজ গোইং অন"
আমি একটু নমনীয় হলাম। যা চাচ্ছিলাম তার সন্ধান পেয়ে গেলাম। আমি ইন্টারপ্রেটারকে বললাম, তুমি সেই  গ্রামে নি‌তে পারবে। সে বলল, “অবশ্যই স্যার চলেন”তার দেখা‌নো নির্দেশিত গ্রামে আধ ঘণ্টার মধ্যে হাজির হলাম। আমি দেখলাম। মিলিশিয়ারা লাঠি দি‌য়ে পিটিয়ে ২জন পুরুষ ও ৩ জন মেয়েকে আহত করেছে। আমি ফাস্ট এইড সৈনিকদের কাজে লাগিয়ে দিলাম। তখন তা‌দের সাথে কথা বলে জান‌তে পারলাম। দশ মিনিট আগেও লু‌টিং করছিল। পাশের গ্রামের কং‌গো‌লিজ আর্মি  তা‌দের ধাওয়া করেছে। আমি কোন রাস্তায় কংগোলীজ আর্মি ধাওয়া করেছে সেই রাস্তায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নি‌য়ে গাড়ী‌তে উঠ‌তে যাব। তখন আমা‌দের কনভ‌য়ের উপর ব্যাপক ফায়ার শুরু করল। আমি  চিৎকার ক‌রে আমার টহলকে বললাম "লাই ডাউন । শু‌য়ে পর। ক্রল ক‌রে আড় নিয়ে ওদের আর্মসের ফ্লাশ দেখে সেই ডি‌রেকশা‌নে ফায়ার কর।"
আমি  আর আমার রানার রাস্তার পাশে একটা বাড়ীর পিছনে ছোট একটা সবজি  বাগানে উঁচু ক‌রে রাখা ময়লার ডিবিতে আড় বা কাভার নি‌য়ে ফায়ার কর‌তে শুরু করলাম। যেখান থেকে মিলিশিয়াদের অস্ত্রের ফায়ারের ঝলক দেখছিলাম সেটা মনে হল ৫০০ গজ নিচে ডাউন হিলে। ডাউন হিল শুটিঙটা সুবিধা জনক নয়। আল্লাহ ভরসা ক‌রে এসএম‌জি দি‌য়ে  সিঙ্গেল বাস্ট আর সিঙ্গেল শর্ট ফায়ার করছি। তখন ওয়া‌কি টকিতে আমার টহল টুআইসি সু‌বেদার মুনির বলল, “এপিসি থেকে ফায়ার করব স্যার”আমি বললাম, ওদের উইপনের ফ্লাশের ডি‌রেকশা‌নে ফায়ার করেন। এপি‌সি‌তে আবার স্ট্রেসার রাউন্ড ছিল। ১২.৭ এম‌জির গগনবিদারী শব্দে ফায়ার শুরু। আমরা এপি‌‌সি ফায়ার শুরুর পর এসএম‌জি ফায়ার বন্ধ রাখলাম। এপি‌সি ফায়ারের দুই মিনিট পর ওয়া‌কি টকিতে ক্যাপ্টেন পার‌ভেজ ক্যাম্প থেকে বলল, “স্যার এপি‌সির ফায়া‌র বন্ধ করেন। বেইজ ক্যাম্পের উপর দি‌য়ে ট্রেসার যাচ্ছে”আমি এপিসির ফায়ার বন্ধ করলাম। রাতের অন্ধকারে আন্দাজে ফায়ার করতেছি। কো‌লেটারাল ড্যামেজ হতে পা‌রে। সকালবেলা গ্রামবাসী লাশ নি‌য়ে হাজির হ‌তে পা‌রে। এদিকে আমা‌দের সাথে থাকা এফআর‌ডি‌সির টহল সদস্যরা  দুইজন মিলিশিয়াকে ধ‌রে ফেলেছে। দুই মিলিশিয়ার হা‌তে লাঠি ছিল। এখানে বলে রাখি ডাকাতি হওয়া গ্রাম‌টি‌তে জান‌তে পেরেছিলাম, মিলিশিয়াদের ৫/৬ জনের হা‌তে ছিল একে ৪৭। বাকী ১০/১২ জনের হা‌তে ছিল লাঠি
এই লাঠি পার্টির দুইজন ধরা পরেছে এফআরডি‌সির হা‌তে। গ্রামের শেষে ঘর‌টি থেকে বেরুতে গি‌য়ে ধরা খেয়েছে। এরা ডাকাতি শেষে মনে হয় ঘরের মালামাল খোঁজ কর‌তে গি‌য়ে ধরা খেয়েছে। এরই মধ্যে এইচএফ সেটে আমার কন্টিনজেন্ট কমান্ডার কর্নেল ইফতেখারের সাথে কথা বললাম। উনা‌কে বললাম, আমি মিলিশিয়াদের ধাওয়া করব কিনা। তিনি ঠাণ্ডা গলায় বললেন। তোমার ওখানে আরো  দু‌টি এপি‌সি আন। একজন অফিসার আন। তারপর স্থানীয়‌দের আরো  জিঞ্জাসাবাদ কর তারপর সিদ্ধান্ত নাও। আমি  বুঝলাম পুরো আয়োজন শেষে আর এদের পিছনে ধাওয়া করা লাভ হরে না। স্বাভাবিক কারণে কন্টিনজেন্ট কমান্ডার টহলের নিরাপত্তা নি‌য়ে চিন্তিত। “হি‌রোইজম" নয়।  অত:পর ক্যাম্প থেকে ক্যাপ্টেন সিরাজ দুইটি  এপিসি নি‌য়ে হাজির। সব কিছু মিলে প্রায় এক ঘণ্টা পার হ‌য়ে‌ গেছে। ক্যাপ্টেন সিরাজ‌কে বললাম, ব্রাদার ব্যাটল ইজ ওভার চল টহল ক‌রে ক্যাম্পে ফেরত যাই। তার পর চারিদিকে আরো ঘণ্টা খানেক সময় ব্যয় ক‌রে টহল শেষ ক‌রে এফআরডিসি ক্যাম্পে আসলাম। এখানে জানিয়ে রাখি আমরা যেই দুইজন মিলিশিয়া ধরতে পেরেছিলাম তা আমরা এফআরডিসি কোম্পানি সদরে পাঠিয়ে ছিলাম। এটাই নিয়ম ছিল। ধৃত আসামী এফআরডিসিকে হস্তান্তর করা হত। কারণ গ্রামে কোন কংগোলিজ পুলিশ নাই। পুলিশই কার্যক্রম তারাই করত। আমি এফআরডিসি ক্যাম্পে গিয়ে দেখলাম, দুই মিলিশিয়াকে দুইটি গর্তের মধ্যে প্রত্যেককে আন্ডারওয়্যার পরিহিত অবস্থায় চারটি খুঁটি দিয়ে হাতপা ছড়িয়ে পশুর মত বেঁধে রেখেছে। আমি ইন্টারপ্রেটারের মাধ্যমে কোম্পানি কমান্ডারকে বললাম, জেনেভা কনভেনশনের যুদ্ধ বন্দীদের নিয়ম অনুসারে যেন এই দুই বন্দীকে ট্রিট করা হয়। আমার এই কথা ইন্টারপ্রেটার বলার পর মনে হল কোম্পানি কমান্ডার ক্ষেপে গেল। সে ইন্টারপ্রেটারের সাথে চিৎকার করতে লাগল। আমি ইন্টারপ্রেটারের কাছে জানতে চাইলাম, কোম্পানি কমান্ডার ক্ষেপে গেল কেন? ইন্টারপ্রেটার বলল, “সে বলল,সে জানে কি করতে হবে। ইউএন দিক নির্দেশনা না দিলেও চলবে”আমি না বোঝার ভান করে থাকলাম। আমি ইন্টারপ্রেটারকে বললাম,কোম্পানি কমান্ডারকে বলে দাও, তার রাগের কারণটা অতি সংগত কারণ মিলিশিয়ারা অনেক রকম অপরাধ করছে। যতই রাগ থাকুক, ধৈর্য ধরে তারা যেন তাদের জিঞ্জাসাবাদ করে ও পরে ব্যাটালিয়ন সদরে বা তাদের ব্রিগেড সদরে পাঠিয়ে দেয়।
আসার পথে ইন্টারপ্রিটারকে জিঞ্জাসা করলাম। এফআরডিসি কোম্পানি কমান্ডার প্রিজনারকে নিয়ে কি করবে। সে বলল। তুমি যেভাবে দেখছ। এভাবে বেঁধে তারা তাদের জিঞ্জাসাবাদ করবে। জিঞ্জাসাবাদ শেষে বুকে বেয়নেট দিয়ে বা গলা কেটে মেরে ওই গর্তে ফেলে মাটি চাপা দিবে। যদি উঁচু দরের মিলিশিয়া হয়, তবে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার ব্যাটালিয়ন সদরে নিবে। অন্যথায় ছোট খাট মিলিশিয়া সদস্য হলে কোম্পানি কমান্ডার মেরে মাটা চাপা দিয়ে দিবে। আমার মন বলল, এটা অন্যায়।
আমি অপস অফিসারকে জানালাম। ওরা মনে হয় ধৃত দুই মিলিশিয়াকে মেরে ফেলবে। আমাকে তিনি বললেন মূলত: আমাদের কাছ থেকে কংগোলীজ পুলিশ বা পুলিশ না থাকলে তাদের আর্মির কাছে হস্তান্তর করার কথা এর বাইরে যাওয়া সুযোগ নেই। তিনি আমাকে অবজারভারদের জানিয়ে রাখতে বললেনতারা খোঁজ খবর নিতে পারে। আমি বুঝলাম আসলে কিছু করার নেই। বিচার এখানে নেই। মানব অধিকার নেই। তবে এটাও চিন্তা করলাম যারা আমার উপর গুলি চালাতে পারে তাদের উপর কোন দরদ দেখিয়ে আসলে কোন লাভ নেই।
ক্যাম্পে আসার পর বুট খুল‌তে খুল‌তে না খুল‌তেই পুনরায় অপস অফিসারের ফোন তা‌কে এ টু জেট বর্ণনা দিলাম প্রায় ঘন্টাখা‌নেক ধ‌রে। তারপর তিনি বললেন, রি‌পোর্টটা জরুরী পাঠানলাও ঠেলা। এবার অফিসের বাবু‌কে ডে‌কে পুরো ঘটনটা বর্ণনা ক‌রে সিটরেপ টাইপ করে ফ্যাক্স করতে বললাম। রাতের খাবার খেলাম ২টায়কারণ ইচ্ছে ছিল টহল থেকে এসের রাত দশটায় ডিনার করবভুল পরিকল্পনা ছিল। হেড‌ কোয়ার্টারে সিট‌রেপ পাঠা‌তে পাঠা‌তে কখন যে রাত দুইটা বেজে গেল টেরই পেলাম না। আমার ইচ্ছে হল পরদিন যেখানে ফায়ার করেছিলাম সেই  স্থানে দিনের আলোতে  পর্য‌বেক্ষন করা।
ঘুম ভাঙ্গল সকাল সাড়ে ছয়টায়।  সাথে সাথে ইউনিফরম পড়ে একটি স্থানে কিছু রক্তমাখা ঘাস পাতা পেলাম। বুঝা গেল আন্দাজে ফায়ার ক‌রে কোন মিলিশিয়াকে হয়ত আহত করা গেছে। অথবা বন্য প্রাণীও গুলি খে‌তে পা‌রে। কং‌গোর সুদূর গ্রাম থেকে রক্তের  স্যাম্পল পাঠিয়ে মানুষের রক্ত না পশুর রক্ত নির্ণয় করা সম্ভব ছিল না।
এ্যাভেবা ক্যাম্পে আমাদের দিনগুলো বেশ ট্রমাতে কাটত। মাঝ রাতে দুই তিন কি:মি: দূরে মিলিশিয়াদের ফায়ারের শব্দ শোনা যেত। হয়ত এরা লুটিং করছে বা নিজেরা আন্ত কলহে ফায়ার করছে। এধরনের ফায়ারে রাতে আমরা “স্ট্যান্ড টু” করতে বাধ্য হতাম। ফলে রাতের ঘুম হারাম। এভাবে প্রতি সপ্তাহে তিন/চার দিন “স্ট্যান্ড টু” ও “ফলস এ্যালার্ম” চলতে থাকে। ফায়ারের শব্দ রাতে অনেক দূর হতে পাওয়া যায়। তারপরও তা তোয়াক্কা করতে হয় কারণ, এটা আক্রমণের পূর্ব লক্ষণ কিনা তা কিন্তু বলা যাচ্ছে না। তাই স্ট্যান্ড টুনা হয়ে পারা যাচ্ছে না। গুলির শব্দের সাথে আমার শ্রবণের একটা ভয়ানক রকম স্পর্শকাতরতা তৈরি হয়েছে। একদিন রাত দুইটায় গুলির মত শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। লাফ দিয়ে উঠে হাফ প্যান্ট গেঞ্জির উপর ইউনিফরম পড়ে গুলির ব্যাগগুলি কাঁধে চাপিয়ে এসএমজি হাতে নিয়ে আমার পেরিমিটার ব্যাংকারের দিকে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হল সৌনিকদের স্ট্যান্ড টুর দৌড়াদৌড়ি ও শোরগোল নেই। তখন মনে হল, আমি কি ভুল করলাম। আমার এক সার্জেন্ট এগিয়ে এসে বলল, “স্যার আপনি এসএমজি নিয়ে বের হলেন”আমি বললাম ,ফায়ার হল তোমরা স্ট্যান্ড টু করছ না কেন। সে বলল, “না তো স্যার ফায়ার হয়নি”আমি যে শব্দ শুনলাম। সে বলল, আমি তো স্যার রাত ১১ টা থেকে জেগে আছি কোন শব্দ কানে আসেনিআপনি মনে হয় ভুল শুনেছেন। আমি বললাম ,শব্দে ঘুম ভাঙ্গল আর আমি চলে আসলাম তুমি বলছ ভুল শুনেছি। অবাক করা ব্যাপার। তার সাথে কথা বলে বলে আগাচ্ছি। মনে হল ঘুম যেহেতু ভাগল। ছয়টা সেন্ট্রি পোস্ট আছে। প্রতিটি পোস্টে দুইজন করে ১২ জন প্রহড়ারত আছে তাদের সাথে কথা বলেই যাই। একটি পোস্টে কথা বলে অন্য একটা পোস্টে দিকে আগাচ্ছি হঠাৎ একটা খোলা ঘরের টিন পড়ে আছে দেখলাম। আমি সার্জেন্টকে বললাম, টিনটা পড়া কেন। সে বলল, বাতাসে আমাদের নামাজের ঘরের বারান্দার টিনটা ছুটে এসে পড়েছে। সার্জেন্ট আমাকে বলল, “এখনও বাতাস বইছে তবে অনেক কমেছে। কিছুক্ষণ আগে বাতাসটা আরো প্রখর ছিল। টিনটা উড়ে আসার সময় অনেক জোরে শব্দ হয়েছিল। এই শব্দটাই ঘুমের গোড়ে ফায়ারের শব্দ মনে হতে পারে স্যার”এখন আমার কাছে মনে হল, এটাই হয়েছে নির্ধিদ্বায় বলা যায়। পরের দিন। ব্রেক ফাস্টের টেবিলে আমার অন্য তিনজন অফিসারদের সাথে ঘটনাটা শেয়ার করলাম। তাদের হাঁসি আর থামতে চায় না। সিরাজ বলল, ফায়ার আর স্ট্যান্ড টু গল্প কোম্পানী টুআইসি রাফি’র কাছে অনেক শুনতে পারবেন। কোম্পানী টুআইসি রাফি আবার তখন বুকিরিংগি ক্যাম্পে ছিল। বুকিরিংগি ক্যাম্পটি আবার এই এ্যাভেবা ক্যাম্পের কমান্ড ও লজিস্টিক সাপোর্টে চলছিল। তাদের সকলেরই রাতে একাধিকার শব্দ শুনে “স্ট্যান্ড টু” হওয়ার অভিঞ্জতা আছে। এটা একটা ট্রমাটাইজ সিচুয়েশন। আমাদের ক্যাম্পের মেডিক্যাল অফিসার ডাক্তার লে: কর্নেল নাসির আমার সিনিয়র। স্যারকে বললাম, উত্তরণের উপায় কি? তিনি বললেন, “সকালে ও বিকালে পিটি গেমস বাড়িয়ে দাও। শরীর ক্লান্ত থাকলে ডীপ স্লিপ হবে তখন টুটকা ফটকা শব্দে তেমন সমস্যা হবে না। আর একটা বিষয়। সত্যিকারের ফায়ারে শব্দ হলে কন্ট্রোল কল করবেডিউটি এনসিও ও ডিউটি জেসিও ডেকে তুলবে। নো টেনশন”আমি বললাম, ভালই বলছেন নো টেনশন। আর টেনশনেই আমার ঘুম আসে না। আমরা অফিসাররা যেখানে থাকতাম ওটা ছিল একটা টিনের ঘর। বাতাসে টিনের ঘরে বিচিত্র শব্দ করে। পুটুস পাটুস, ফটাস ফটাস মনে হয় দূরের ফায়ারের শব্দ। এখানে এই রূপ ট্রমাটিক সিচুয়েশন বড়ই পীড়াদায়ক। ক্যাম্পের চারজন অফিসারের মধ্যে দুইজন অনেক রাত জেগে থাকে। আবার দুইজন আগে ঘুমায় ও খুব ভোরে উঠে। চারজনের দুই ধরনের অভ্যাস থাকায় কোম্পানী কমান্ডার হিসাবে আমার কাছে ভালই মনে হল। রাতের অর্ধেক অটোমেটিক পাহাড়া হয়ে যাচ্ছে। আর খুব ভোরেও পাহাড়া হয়ে যাচ্ছে। মিলিশিয়াদের ডন এট্যাক, ডাস্ক এ্যাটাক ও মিড নাইট এ্যাটাক সিচুয়েশন কাভার করার জন্য আমার কোম্পানির লোকজন সতর্ক আছে।
এ্যাভেবা ক্যাম্পে আমার প্রথম রাতের কথা মনে পড়ল সেদিন রাত দেড়টায়ও আমরা জেগে আছি। টিভি দেখছি। হঠাৎ টাশ টাশ শব্দ। মনে হল বেশী দূরেও নয়সাথে সাথে। আমাদের একটা পোস্ট থেকে এলএমজি’র ঘন ঘন বাস্ট ফায়ার। আমরা দুই অফিসার ছুটলাম ফায়ার রত এল এমজি পোস্টের দিকেচিৎকার করে ফায়ার বন্ধ করালাম। জানতে চাইলাম, কেন ফায়ার করছ। সে বলল,“স্যার এই দিক থেকে ফায়ার এসেছিল”আমি জানতে চাইলাম, তুমি কি ফ্লাশ দেখেছ। সে বলল, “জী স্যার”আমি বললাম, তুমি ফায়ারের শব্দ শুনেছ। ফায়ার করেছ। আমরা এমটি কার্টির্জ গুনে দেখলাম। ৭৫ রাউন্ড ফায়ার করেছে। আমি সেন্ট্রিকে বললাম, তোমাকে ফায়ার করল দুই রাউন্ড আর তুমি ফায়ার করলে ৭৫ রাউন্ড এটা কেমন করে হয়। আমার খুব রাগ হল। পরে কন্টিনজেন্ট কমান্ডার কর্নেল ইফতেখারের সাথে আলোচনা করলাম। তিনি ধীর স্থিরভাবে বললেন, “এটা হল,ব্যাটল ফিল্ড স্ট্রেসতোমার সৈনিক স্ট্রেসড অবস্থায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত ফায়ার করেছে। বকা বকির প্রয়োজন নাই। সৈনিকদের মোটিভেশন ও রিফ্রেশর ট্রেনিং বাড়িয়ে দাও”“পরের দিন এক শত্রু এক বুলেট”এ উপর ট্রেনিং চলতে লাগল। এখানে বলে রাখি মিশন এরিয়ার স্ট্রেসড সিচুয়েশন রিমুভ করার জন্য সকালে পিটি ও বিকালে গেইমস ক্যাম্পে চালু ছিল। এছাড়া ইউএন খাবার অনেক উন্নত যা বার্ন করার জন্য নিয়মিত পিটি ও গেইমসের কোন বিকল্প নাই। এটা না করলে সৈনিকের ওভার ওয়েট ঠেকানো দায় হয়ে যেত। ডিউটি ব্যতীত বাকী ইউনিফরম পড়া অবস্থায় বিভিন্ন  ধরনের রিফ্রেশর ট্রেনিং ছিল প্রতিদিনের রুটিনের অংশ। বাংলাদেশী পীস কিপাররা অনেক বেশী প্রফেশনাল কার্যক্রম সাধারণত ইউএন ডেপ্লমেন্টে প্রদর্শন করে থাকে। এতে বাংলাদেশের সুনাম আছে।
সেই সৈনিকের মধ্য রাতের ফায়ারের ঘটনার পর মধ্য রাতে আমার মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙ্গে যেত। একটু শব্দ হলেই কান খাড়া হয়ে যেত। পরদিন এফআরডিসির লিয়াজু অফিসারের কাছে জানতে চাইলাম। গতকাল রাতের ফায়ারের কারণ কি। শুনলাম ক্যাম্প থেকে আনুমানিক ৭০০ গজ দূরে মিলিশিয়ারা লুটিং করার জন্য গ্রামে ঢুকে ছিল। গ্রামে ঢোকার আগে এরা দুই এক রাউন্ড ফায়ার করে ওরা প্যানিক ক্রিয়েট করে। আমি তাকে বললাম, এক সপ্তাহ আগে এদের ধাওয়া করলাম। দুইজন ধরলাম। তবে এরা আবার সাহস পেল কিভাবে এখানে আসার জন্য। সে বলল, “আপনাদের ধাওয়া খেয়েছে যারা তদের বদলী করে মিলিশিয়াদের নতুন গ্রুপ এসেছে এই এলাকায় সন্ত্রাসী কাজ করার জন্য” আমি এফআরডিসির এলওকে বললাম, আমরা এই এলাকা থেকে মিলিশিয়াদের মূল উৎপাটন করতে চাই। তুমি তাদের তথ্য সংগ্রহ করে দাও। কোথায় এদের হাইড আউট রয়েছে এবং কোন ট্রেইল ধরে যাতায়ত করে। হাইড আউট জানা গেলে হেলিকপ্টার গান শিপ দিয়ে এ্যাটাক করা যেতে পারে। ট্রেইল জানা গেলে এ্যামব্বুশ করা যেতে পারে। সহযোগীতার আশ্বাস দিয়ে এলও বিদায় নিল।
এলওরা এফআরডিসির অফিসার তারা ইউএন ক্যাম্পের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে। এরা তথ্য দিয়ে সহায়তা করে থাকে। টহলেও অংশগ্রহণ করে থাকে। এদের অনেক এলও ইংরেজি জানে আবার দীর্ঘদিন বছরের পর বছর কাজ করে এদের অনেকে বাংলাও জানে। আমি বুকিরিংগি নামক একটা ক্যাম্পে থাকতে একজন এলওর সাথে এমন সখ্যতা হয় সে অনেক দিন আমি বাংলাদেশে চলে আসার পরও ফোন করত
কঙ্গোর ব্যানব্যাট-১ এর এলাকার বুকিরিংগি আর এ্যাভেবা ক্যাম্পগুলি মিলিশিয়া অধ্যুষিত এলাকা ছিল। এখানে ফায়ারের শব্দ আর মিলিশিয়াদের শুটিং ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। মিলিশিয়াদের সাথে কংগোলীজ আর্মির এফআরডিসি ও ইউএন ফোর্সের লাগাতার “টম এন্ড জেরী” খেলা চলতে থাকে। একদিকে মিলিশিয়া গেলে এফআরডিসি আর ইউাএন ফোর্স ধাওয়া করল। আবার মিলিশিয়ারা অন্যদিকে চলে যায়এভাবে খেলা চলতে চলতে কন্টিনজেন্টের এক বছর সময় চলে যায়। বৌ বাচ্চার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য সৈনিকদের আকুতি বাড়ে। চোখে খুশির চমক আসতে থাকে। নতুন দল নতুন চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে “টম এন্ড জেরী খেলা”র জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। পুরাতন দল সাদা ধবধবে প্লেনে চড়ে যখন দেশে ফিরে তখন ভয়ানক শান্তি আর ভয়ানক ট্রমা থেকে স্বস্থি। এভাবে চলতে থাকে নতুন পুরাতনের বদল। নতুন নতুন খেলা। রক্তারক্তির খেলা। ২০১৮ সালে প্রথমে যখন লেখাটি লেখছি তখনও চলছেকবে শেষ হবে কেউ জানে না।